সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২ আশ্বিন ১৪২৮
শিরোনাম: কাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন       জার্মানীতে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়ী এসপিডি       মেগা প্রকল্প উদ্বোধন হলে বিএনপি নেতারা চোখে সর্ষে ফুল দেখবে : সেতুমন্ত্রী       অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যটনের গুরুত্ব অবশ্যম্ভাবী : প্রধানমন্ত্রী        ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ঢেলে সাজানোয় সক্ষমতা বেড়েছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী       বিএনপি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জবাব দেওয়া হবে : ওবায়দুল কাদের       শেখ হাসিনার সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস নবীন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে : স্পিকার       
বিপজ্জনক সংক্রমণে ১৭ জেলা ও জনগোষ্ঠী প্রসঙ্গ
ড. মো. ফখরুল ইসলাম
প্রকাশ: শনিবার, ১২ জুন, ২০২১, ২:৫৫ পিএম |

অজ পাড়াগাঁয়ে হঠাৎ করোনা সংক্রমণের উচ্চগতি দেখে চমকে যাচ্ছে সীমান্তবর্তী ১৭ জেলার মানুষ। বিশেষ করে, সেখানকার নদীপাড়গুলোর মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত। নদী এলাকার গ্রামগুলোতে ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ আক্রান্ত। এই সংক্রমণের প্রধান কারণ ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি, যাকে আগে ডাকা হতো ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বলে। বিপজ্জনক এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণের শিকার হয়ে সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণহীন পড়লে মানুষ কি প্রতিবেশী দেশের গ্রামে আক্রান্ত মানুষের মতো দিশেহারা হয়ে যাবে? সেটা এখন শুধু প্রশ্নই নয় বরং ভয়াবহ এক চিন্তা। আক্রান্ত জেলাগুলোতে কড়া লকডাউন এখন বিশেষ প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা-সামগ্রী, অক্সিজেন সিলিন্ডার, চিকিৎসক, সবার উপস্থিতি প্রয়োজন।
কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয় ইত্যাদি রোগ পানিতে ছড়ায় কিন্তু করোনা পানিবাহিত রোগ নয় বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মতামত রয়েছে। আগেকার দিনে এক গ্রামে কলেরা দেখা দিলে রোগীর কাপড়চোপড় পুকুর বা নদীতে ধোয়ার ফলে সারা গ্রামে কলেরা ছড়িয়ে যেত। উজানের নদীতে কলেরার জীবাণু ছড়ালে তা কয়েক দিনের মধ্যে ভাটির দিকে সংক্রমিত হতো। এভাবে কোনো নদীর তীরবর্তী শত শত মাইল দূরের ভাটির শহর-বন্দরে-গ্রামে কলেরা-সংক্রমিত হয়ে বহু জনপদ বিলীন হয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। করোনা যেহেতু পানির মাধ্যমে ছড়ায় না, সেহেতু পানি ব্যবহারে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে এসেছে জনমনে।
করোনা শুরুর প্রথম দিকে পানিতে এর সংক্রমণ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে অনেক গবেষণা হয়েছিল। ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরে ‘নেচার’ পত্রিকার বরাত দিয়ে একটি সংবাদমাদ্যম প্রকাশ করেছিল, ‘পানিতে ছড়াতে পারে প্রাণঘাতী করোনা।’ গোটা বিশ্বের মানুষ ভয় পেয়েছিল এই সংবাদে। কারণ, পানিতে করোনা ছড়ালে মানুষের অস্তিত্ব বিলীন হতে বেশি দেরি লাগবে না।
পানির মাধ্যমে না ছড়ালেও ২৩-২৫ ডিগ্রি পানির তাপমাত্রায় করোনা ভাইরাস ১০ দিন বেঁচে থাকতে পারে। ই-লাইকের গবেষণায় দেখা গেছে, করোনা পজিটিভ ব্যক্তির এক গ্রাম মলে রয়েছে ১০০ মিলিয়ন আরএনএ। এগুলো ড্রেনের পানিতে মিশে গেলে কী ক্ষতি হতে পারে, সেটা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। মানুষ বা প্রাণী সেই দূষিত পানি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহার করলে সংক্রমিত হবার আশঙ্কা রয়েছে। সংক্রমিত ব্যক্তির টয়লেটের ফ্লাশ থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে করোনা ভাইরাস। টয়লেট ব্যবহারের পর মলদ্বারে থেকে কাপড়ে লেগে যাওয়া ভাইরাস সোফায় বা বসার স্থানে সংক্রমিত হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল। তখন নদনদীতে করোনা বর্জ্য না ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ২০২১ সালে ভারতের বিহারে ভয়ংকর করোনা সংক্রমণে মৃতদের যথাযথ সৎকারের অভাবে মৃতদেহকে নদীতে ভাসিয়ে দিতে দেখা গেছে। রাতের বেলা ব্রিজের ওপর থেকে মৃতদেহকে নদীতে ছুড়ে ফেলার ভিডিও দেখা গেছে। বিহারের গ্রামগুলো থেকে একসঙ্গে ৪০টি মৃতদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ বলেছেন, শত শত মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। শ্মশানে জায়গা না থাকায় নদীতীরের বালুতে কম গভীরতায় লাশ পুঁতে রাখায় সেগুলো শিয়াল-কুকুর, চিল-কাক প্রভৃতি টেনে বের করে বাতাসে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। মূল বাহকে এর সংস্পর্শে আসা আত্মীয়স্বজন ও অন্যান্য মানুষ। সেখান থেকে নৌযাত্রী, জেলে, মাঝি, পুণ্যার্থী, ভ্রমণকারী, দর্শক ইত্যাদির মাধ্যমে শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে গেছে ভাইরাস। এসব কোনো তথ্যই সাধারণ গ্রামাঞ্চলের মানুষ জানে না।
আমাদের উজানে ভারতের গঙ্গা নদীতে যখন মৃতদেহ ভাসছে তখন রাস্তায় যেমন ট্রাক চলছে, নদীতে নৌযান চলাচল করছে। ট্রাকের ড্রাইভাররা স্থলবন্দরগুলোতে পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে ঢুকে হোটেল-রেস্তোরাঁয় থাকছে-খাচ্ছে। নৌবন্দরগুলোতে কড়াকড়ি না থাকায় আরো বেশি করে ঢোকার সুযোগ পেয়েছে তারা।
চোরাচালানির কথা তো মাথায়ই নেই। স্থলে কড়াকড়ি থাকায় নদীপথে বেশি চোরাচালান হয় রাতের বেলা। গরু, কাপড়, মসলা, প্রসাধনী সবই আসে রাতের নৌকায়, চোরাপথে। তা না হলে হাটেবাজারে এত পরিমাণ আমদানিনিষিদ্ধ দ্রব্য চোখে পড়ে কীভাবে? চোরাচালানিদের বিরাট অংশ করোনা সংক্রমিত কি না, তার তো কোনো পরিসংখ্যান নেই। কারণ, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে অবস্থান করে। নিভৃত পল্লিতে ফেরিওয়ালারা চোরাচালানের নিষিদ্ধ পণ্য ফেরি করে বিক্রি করে বেড়ায় কোনো রকম কোয়ারেন্টাইন ছাড়াই। এদের চৌর্যবৃত্তির মধ্যে আমরা দেশের অভ্যন্তরে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ঠেকাব কী করে?
জুন মাসের শুরু থেকে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১৭ জেলার গোটা সীমান্ত জুড়ে করোনার আতঙ্ক বিরাজ করছে। উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁও থেকে দক্ষিণের সুন্দরবনের কাছে দাকোপ উপজেলায় ভয়াবহ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত দুই সপ্তাহ ধরে লকডাউন চলছে। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মহানন্দা নদীতে ভারত থেকে ভেসে এসেছে গলিত লাশ। সুন্দরবন-সংলগ্ন দাকোপের খাটাইল গ্রামে ২৫ মে থেকে জুনের ৮ তারিখ পর্যন্ত ৩৩ জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, দাকোপ উপজেলার চুনকুড়ি নদী দিয়ে ভারতে যাতায়াতকারী দেশি-বিদেশি কার্গো, লাইটার জাহাজ, ট্রলার ইত্যাদি চালনা এলাকায় নোঙর করলে ডাঙায় উঠে আসা নাবিক ও লোকজন বাজার করে, হোটেল-রেস্তোরাঁয় খায়, ঘোরাফেরা করে। এদের দ্বারা ভয়ংকর ডেলটা ধরন ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা করছে এলাকার মানুষ।
নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পশুর নদ, চুনকুড়ি নদী থেকে চুরি করে তারা নামছে স্থানীয় টাউটদের সহযোগিতায়। একজন বলেছে, তাকে চার লিটার তেল দেওয়ার বিনিময়ে নামাতে চেয়েছিল। সে নেয়নি কিন্তু আরেক জনকে আট লিটার তেল দিয়ে নামিয়েছে। এছাড়া মোংলা পোর্ট এলাকায় হুহু করে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। জাহাজ, কার্গোর বিদেশিরা ঘুষ দিয়ে, তেল দিয়ে ডাঙায় নেমে আসছে ও স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে চলাফেরা করছে। ভারতে বর্তমানে ডেলটার চেয়েও মারাত্মক ধরনের ভাইরাসের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আরো ভয়াবহ সংক্রমণ ছড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে নোয়াখালী ও কুড়িগ্রামের স্থলবন্দর ও নদী এলাকার গ্রামগুলোতে সংক্রমণের কথা জানা গেছে।
১৭টি জেলার সীমান্ত গ্রাম ছাড়িয়ে করোনার সংক্রমণ জেলা শহর এবং রাজধানী ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সীমান্ত জেলা থেকে ঢাকামুখী বাস, ট্রেন, কার, ট্রাক, সবকিছু রাতদিন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল করছে। অচিরেই রাজধানী ঢাকায় আবারও সংক্রমণের উচ্চহার শুরু হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
ভারতে জুন ১০ তারিখে গত ২৪ ঘণ্টায় ৬ হাজার ১৪৮ জনের প্রাণহানির মাধ্যমে এ পর্যন্ত করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। দিল্লির ১০০ কিলোমিটার দূরে কৌটিলা গ্রামের নদীর তীরের বালুতে পুঁতে রাখা হয়েছে সারি সারি লাশ। ভারতের মতো দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি আমরা চাই না। আমাদের সীমান্তের জেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ, ভেন্টিলেটর, হাইফ্লো অক্সিজেন সরবরাহ কিছুই নেই। সেসব স্থানে জরুরি লকডাউন দিয়ে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া বিকল্প আর কী আছে? এ মুহূর্তে শুধু লকডাউন সমাধান নয়। এর সঙ্গে জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা-সামগ্রী, অক্সিজেন সিলিন্ডার, চিকিৎসক এবং সবাইকে স্বাস্থ্যসচেতনতা মেনে ধৈর্য ধরে কাজ করাও খুব জরুরি।
করোনাকে আমন্ত্রণ না জানালে কারো বাড়িতে আসে না, সে নিজে নিজে কারো ঘরে সহজে ঢোকে না। তাই অতি দ্রুত ১৭টি সীমান্ত জেলায় রেড অ্যালার্ট দিয়ে লকডাউন জারি করে বর্ডারের সব কার্যক্রম পুনরায় স্থগিত করে দিতে হবে। আমাদের অবহেলা, তাচ্ছিল্য ও অসতর্কতার খেসারত আর যেন দিতে না হয়। নদীর পানিতে সরাসরি সংক্রমণ না ছড়ালেও নদীতে চলাচলকারী বেপরোয়া মানুষগুলোর চরম উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে আর কত প্রাণ কেড়ে নেবে করোনা নামক অদৃশ্য অণুজীব? কোনো গ্রামের মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে হতাশ ও দিশেহারা হয়ে শেষমেশ উজাড় হয়ে গেলে আমরা কি গ্রাম আধুনিকায়নের সুযোগ পাব?

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

এনএনবি নিউজ/ ডিকে






আরও খবর


সর্বশেষ সংবাদ
কাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন
জার্মানীতে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়ী এসপিডি
মেগা প্রকল্প উদ্বোধন হলে বিএনপি নেতারা চোখে সর্ষে ফুল দেখবে : সেতুমন্ত্রী
অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যটনের গুরুত্ব অবশ্যম্ভাবী : প্রধানমন্ত্রী
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ঢেলে সাজানোয় সক্ষমতা বেড়েছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিএনপি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জবাব দেওয়া হবে : ওবায়দুল কাদের
শেখ হাসিনার সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস নবীন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে : স্পিকার
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
অন্যরকম ম্যাগাজিনে বাংলাদেশের মি. বীন রাশেদ শিকদার
অস্ট্রেলিয়ায় ৬ মাত্রার ভূমিকম্প
আইসিটি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নীল অর্থনীতিতে মার্কিন বিনিয়োগ আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
ঢাকার সিনেমায় কলকাতার কৌশানী
বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার আগ মুহূর্তে করোনা পজিটিভ দিয়া
রোলস-রয়েসের বিদ্যুচ্চালিত প্লেনের সফল উড্ডয়ন
সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ২৬ সদস্যের প্রাথমিক দল ঘোষণা
সম্পাদক : মোল্লা জালাল | নির্বাহী সম্পাদক: দুলাল খান
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৪২/১-ক সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।  ফোন +৮৮ ০১৮১৯ ২৯৪৩২৩
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত এনএনবি.কম.বিডি
ই মেইল: [email protected], [email protected]