সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২ আশ্বিন ১৪২৮
শিরোনাম: কাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন       জার্মানীতে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়ী এসপিডি       মেগা প্রকল্প উদ্বোধন হলে বিএনপি নেতারা চোখে সর্ষে ফুল দেখবে : সেতুমন্ত্রী       অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যটনের গুরুত্ব অবশ্যম্ভাবী : প্রধানমন্ত্রী        ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ঢেলে সাজানোয় সক্ষমতা বেড়েছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী       বিএনপি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জবাব দেওয়া হবে : ওবায়দুল কাদের       শেখ হাসিনার সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস নবীন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে : স্পিকার       
যে বিশ্বাস এখনো অটুট আছে
সুধীর সাহা :
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ জুন, ২০২১, ২:৫১ পিএম |

পরপর দুটি ঘটনা সামনে আসায় মনে হলো এ নিয়ে একটু লিখলে কেমন হয়! দুটি ঘটনা জুড়েই আছেন ভারতের দুজন মহান ব্যক্তি। একজন চিকিৎসকÑ ডা. রেখা কৃষ্ণ। কেরেলার সেভানাতে তার কর্তব্যরত হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন এক মুসলিম রোগী। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ভেন্টিলেটর সহায়তায় রাখা হয়। পরিবারের কারোরই তার কাছে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। ১৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে তার কাছে ডা. রেখা ও নার্স ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে রোগীকে ভেন্টিলেটর থেকে নামানো হয়। জীবনের শেষ মুহূর্তে তার সঙ্গে তখন ডা. রেখা। হঠাৎ রোগীটি হাত-পা নাড়াচাড়া বন্ধ করে দিলে নীরবে তার জন্য প্রার্থনা করছিলেন ডা. রেখা। একসময় তার কী মনে হলো! তিনি রোগীর কানে কলেমা শাহাদাত পাঠ করে শোনান। রেখা জানান, এটি একটি ধর্মীয় নিয়ম, তবে মানবিক দায়িত্বও। দ্বিতীয় ঘটনার মহান ব্যক্তির নাম রেজাউল খান। রোহিত ঘোষ নামের প্রৌঢ়ের আকস্মিক মৃত্যুর পর করোনা সংক্রমণের ভয়ে দাহ করার কাজে এগিয়ে আসেনি কেউই। স্ত্রী আর মেয়ে ছাড়া পরিবারের লোক সরে গিয়েছে, পাশের বাড়ির লোক ভেগে পড়েছে। কিন্তু বাঁকুড়ার ইদপুর পঞ্চায়েত সমিতির পূর্তকর্মী রেজাউল খান পিপিই কিট পরে দেহ নিয়ে শ্মশানে গিয়ে দাহ করালেন সেই বৃদ্ধের। সারাটা রাত রেজাউল মৃত পরিবারের লোকদের পাশে থাকেন সাহায্যের দূত হিসেবে।
এর পাশাপাশি অন্য একটি চিত্র। লোকটি হিন্দু না মুসলমান, তার উত্তর মিলছে না গত সাত বছর ধরে। ফলে মর্গেই পড়ে রয়েছে লোকটির মৃতদেহ। খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরী ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। প্রথমা স্ত্রী মীরা নন্দীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ না করেই তিনি ১৯৮০ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং চার বছর পর ১৯৮৪ সালে ইসলাম শরিয়ত মতে বিবাহ করেন হাবিবা আক্তার খানম নামের এক মুসলমান মহিলাকে। ২০১৪ সালের জুন মাসে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় খোকনের। তার মরদেহের আজও কোনো গতি হয়নি। দুই ধর্মের দুই স্ত্রী তার লাশের দাবি করেন। দুই স্ত্রী নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী স্বামীর সৎকারের ব্যবস্থা করতে চাইছেন। বিষয়টি গড়ায় আদালতে। কোনো মীমাংসা না হওয়ায় দীর্ঘ সাত বছর ধরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গের ডিপ ফ্রিজে রয়েছে খোকনের দেহ। মামলাটি চলছে ঢাকার সহকারী জজ আদালতে। মূল সংঘাতটি হয়তো অন্য জায়গায়! সংঘাত বেধেছে খোকনের রেখে যাওয়া সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে। রাজধানী ঢাকার ফার্মগেটে খোকনের একটি মার্কেট রয়েছে। ঐ মার্কেটের ভাড়া তোলা ও সম্পত্তির মালিকানা নিয়েই মূলত এ লড়াই। তাই জীবিত খোকনের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন না পড়লেও মৃত খোকনের দেহটি তাদের দুজনেরই প্রয়োজন। কেননা, ঐ মৃতদেহটিই নির্দিষ্ট করে দেবে খোকনের সম্পত্তির মালিকানার টিকিট।
প্রায় ১২৪ বছর আগে আক্ষেপের সুরে সমাজকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ‘আমরা বহু বৎসর পাশে পাশে থাকিয়া এক ক্ষেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা একই সুখে-দুঃখে মানুষ, তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই।’ সদ্য প্রয়াত শঙ্খ ঘোষ সেই ১৯৯৭ সালে লিখেছিলেন ‘প্রতিদিনের চর্চায় সেই অনায়াস সম্বন্ধ আমরা গড়ে তুলতে পারিনি, একের উৎসবকে করে তুলতে পারিনি অন্যেরও উৎসব।’ প্রশ্ন জাগাই তো স্বাভাবিক, কেন এমনটা হলো? আমাদের মধ্যে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে সামাজিক মেলামেশার ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি কেন হলো না? নতুন শতাব্দীর মানুষকে তাই রেজাউল খান আর ডা. রেখার কথা মনে করিয়ে দিয়ে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ধার্মিক মানুষ আর ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ একই সঙ্গে পাশাপাশি বসতে পারে, যেখানে এক সম্প্রদায়ের মানুষ শুধু মানুষ পরিচয়েই মেলাতে পারে হাত; যেখানে একের আনন্দ, একের উৎসব সঞ্চারিত হয়ে যেতে পারে অন্যের আনন্দে, অন্যের উৎসবে। সাহিত্য-সংস্কৃতির গবেষণায় বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফারসি, আরবি সূত্রের যেমন কোনো দ্বন্দ্ব নেই, পার্থক্য নেই—তেমনি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শঙ্খ ঘোষ, কবি শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ আর গালিব, ইকবাল, ফায়াজ কিংবা নোবেলজয়ী ইরানি কবি-সাহিত্যিক শিরিন এবাদির চর্চাতেও কোনো দ্বন্দ্ব নেই।
এত দিনে সবারই বুঝে যাওয়ার কথা, ধর্মান্ধতা কীভাবে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ থেকে শিক্ষাব্যবস্থা সবকিছুতেই ধস নামিয়ে দিচ্ছে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে পৃথিবীর কোথাও কোনো দেশে উন্নয়ন হয়েছে কি? সংখ্যালঘু থেকে প্রান্তিক মানুষ ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করেন। তা তো মানবসভ্যতার জন্য বড়ই দুঃখের, বড়ই লজ্জার! শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিক্ষাক্ষেত্র সবকিছুই তখন আন্তর্জাতিক স্তরে জায়গা করার পরিবর্তে ঘরকুনো হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে একদল স্বার্থবাদী মানুষ তাকে আরো টেনে নামিয়ে দেয়। একজন লেখককে শুধু তার ধর্ম পরিচয়ে তাকে চিহ্নিত করে দেয় কোনো নির্দিষ্ট দেশের দালাল রূপে। মুসলিম হলে পাকিস্তান বা সৌদি আরবের দালাল, হিন্দু হলে ভারতের দালাল, কমিউনিস্ট হলে রাশিয়া-চীনের দালাল, পুঁজিবাদী ধ্যানধারণার হলে আমেরিকার দালাল, এসব বস্তাপচা অসার স্লোগান যে পথ হারিয়ে ফেলেছে, তা ইতিমধ্যে বিশ্বের অনেকে বুঝলেও কিছু ধর্মান্ধ মানুষ এখনো এমনটাই বিশ্বাস করে। তারা ভুলে যায় ভারতে মুসলিম জনসংখ্যার অঙ্কটা কত, সেখানে মসজিদের সংখ্যাটা কত। তারা ভুলে যায় ভারতের সংস্কৃতি, যোগ বা আয়ুর্বেদ, রামায়ণ, মহাভারত নিয়ে চর্চা হয় সৌদি আরবের স্কুলেও।
মানুষ হিসেবে ভ্রাতৃত্ববোধ চেতনাকে আমরা সব সময় হয়তো ধারণ করতে পারিনি প্রবলভাবে। আমাদের প্রেমাশক্তি এক হয়ে এক স্বরে তোড়ের মুখে বিভেদের সুরকে ভাসিয়ে দিতে পারেনি অনেক সময়ই। কিন্তু তার পরও আমাদের ভরসাটুকু উঠে যায়নি। আমাদের বিশ্বাসটুকু এখনো বেঁচে আছে। আমরা মানুষ হিসেবে যে শিক্ষা পেয়েছি, তার জোরে আমরা মন্দির নিয়ে, মসজিদ নিয়ে, গির্জা নিয়ে লড়াই করি না। ধর্মস্থানকে আমরা রাজনীতির অঙ্গন ভাবি না। আত্মচৈতন্যে আমরা মগ্ন হয়ে বলি—‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। আমরা বিশ্বাস করি, মানবের অখ- সত্তাকে কখনো শ্রেণি, কখনো ধর্মীয় ভেদরেখায় আটকে রাখা যাবে না। যারা মানুষকে মানুষ না ভেবে বরং ভাবে নিছক একটি সাম্প্রদায়িক জীব, তাদের প্রচেষ্টা যতটাই শক্ত হোক, তা পৃথিবীতে সফলতার মুখ দেখতে পারে না, এ বিশ্বাস মানুষের আছে।
আমরা আজ অনেকেই হয়তো সেই বিশ্বাসের জোরটা হারিয়েছি। তাই নানা যুক্তির জাল বুনি, রকমারি তত্ত্ব খাড়া করি। কিন্তু ধর্মের নামে যারা চূড়ান্ত অধর্মের কারবার চালায়, তাদের প্রত্যাখ্যান করে বলতে পারি না—‘আগে ইনসানিয়াত। যখন একটি মানুষের খিদে পায়, সেই খিদে তো আর হিন্দু খিদে আর মুসলিম খিদে এভাবে আলাদা করা যায় না।’ এসব কথা আমরা জানি। জেনেও আমরা ভুলে যাই; ভুলিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মনে রাখা আমাদের কাজ, আমাদের দায়িত্ব ও দায়।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

এনএনবি নিউজ/ ডিকে






আরও খবর


সর্বশেষ সংবাদ
কাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন
জার্মানীতে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়ী এসপিডি
মেগা প্রকল্প উদ্বোধন হলে বিএনপি নেতারা চোখে সর্ষে ফুল দেখবে : সেতুমন্ত্রী
অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যটনের গুরুত্ব অবশ্যম্ভাবী : প্রধানমন্ত্রী
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ঢেলে সাজানোয় সক্ষমতা বেড়েছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিএনপি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জবাব দেওয়া হবে : ওবায়দুল কাদের
শেখ হাসিনার সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস নবীন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে : স্পিকার
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
অন্যরকম ম্যাগাজিনে বাংলাদেশের মি. বীন রাশেদ শিকদার
অস্ট্রেলিয়ায় ৬ মাত্রার ভূমিকম্প
বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার আগ মুহূর্তে করোনা পজিটিভ দিয়া
আইসিটি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নীল অর্থনীতিতে মার্কিন বিনিয়োগ আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
ঢাকার সিনেমায় কলকাতার কৌশানী
রোলস-রয়েসের বিদ্যুচ্চালিত প্লেনের সফল উড্ডয়ন
সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ২৬ সদস্যের প্রাথমিক দল ঘোষণা
সম্পাদক : মোল্লা জালাল | নির্বাহী সম্পাদক: দুলাল খান
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৪২/১-ক সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।  ফোন +৮৮ ০১৮১৯ ২৯৪৩২৩
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত এনএনবি.কম.বিডি
ই মেইল: [email protected], [email protected]